ডায়েরি লেখেন, করেন পড়াশোনাও, অনেক দেশ নাগরিকত্ব দিতে চাইলেও বিমানবন্দরেই কাটিয়ে দেন ১৮ বছর

দ্য টার্মিনাল ম্যান, মেহরান করিম ই নাসিরী। যিনি সবার কাছে টার্মিনাল ম্যান হিসেবে পরিচিত। জীবনের আঠারোটা বছর টানা সে কাটিয়েছে বিমানবন্দরে কিন্তু কেন সেটাই আজ জেনে নেওয়া যাক। হাজার ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ এইটা না ১৮ টি বছর তিনি একটি বিমান বন্দরে কাটিয়েছেন যার নাম, সার্লে দিগৌলে বিমানবন্দর।স্বাভাবিকভাবেই সেখানে তিনি জীবনযাপন করতেন খাওয়া-দাওয়া লেখাপড়া এবং আরো যাবতীয় কাজ সেই বিমানবন্দরেই। স্বাভাবিকভাবেই বিমানবন্দরে সর্বত্র আসা যাওয়া যাত্রীদের, সেখানে যখন একজন নিজের ঘর বানিয়ে তোলে সেটা অনেকটাই চোখে লাগার মতো। তাকে সেই এয়ারপোর্ট থেকে সরানোর জন্য অনেক মামলা পর্যন্ত হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে যখন দিন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তাকে কোনোভাবেই সরানো যায়নি সেখান থেকে।

তিন বছরের জন্য তিনি একটি কোর্স করেন ব্রিটেনের ইউনির্ভাসিটি অব ব্রাডফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৩। তিনি ছিলেন ইরানের বাসিন্দা,তাই এই কোর্স পাস করে তিনি ফের ফিরে যান ইরানে। তবে তার দাবি ১৯৭৭ সালে ইরানের শেষ রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। আর সে কারণেই তাকে বের করে দেওয়া হয় ইরান থেকে। এরপর একাধিক দেশের নাগরিকত্বের আবেদন করলেও তাকে দেওয়া হয়না নাগরিকত্ব। এদিকে আবার বেলজিয়ামের ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজির তরফ থেকে তাঁকে দেওয়া হয় উদ্বাস্তুর তকমা। তবে এই উদ্বাস্তু তোকমা পাওয়ার পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঢোকার অনুমতি পায় সে। ১৯৮৮ সালে প্রথম তিনি ফ্রান্স থেকে লন্ডনের বিমানে ওঠেন। কিন্তু ইমিগ্রেশন অফিসার দের কাছে নিজের পাসপোর্ট দেখাতে না পারায় তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফ্রান্সে।

আর তার পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তিনি দাবি করেন ফ্রান্সের বিমানবন্দরেই তার ব্যাগ চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে দেখাতে পারেনা পাসপোর্ট। তবে গ্রেফতারের পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় কারণ তিনি পাসপোর্ট দেখাতে না পারলেও দেখায় আরো কিছু তথ্য নথি। এই নাসেরীর ইচ্ছা ছিল ব্রিটেনে যাওয়ার সেখানে বসবাস করার, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। যখন তিনি উদ্বাস্তু তকমা পান, তখন তার পর থেকেই তাকে আর কোন দেশে পাঠানো সম্ভব হয় না, আর সেই কারণেই ফ্রান্সের সে বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনাল হয়ে ওঠে তার ঘর বাড়ি। পরবর্তীতে তাকে সরানোর অনেক চেষ্টা করা হয় এমনকি মামলা পর্যন্ত করা হয়।

তবে ১৯৯২ সালে ফ্রান্স আদালত জানিয়ে দেয় নাসেরি কখনই বেআইনিভাবে বিমান বন্দরে প্রবেশ করেনি তাই তাকে সেখান থেকে সরানো সম্ভব নয়। এর পরেই তিনি একেবারে টানা ১৮ টি বছর কাটিয়ে দেয় সেখানেই। তার এই ১৮ বছরে তিনি সেখানে পড়াশোনা করতেন ডায়েরি লিখতেন বিমানবন্দরের কর্মীদের সঙ্গে গল্প করতেন, আর বিমানবন্দরের তরফ থেকেই দেওয়া হতো তাকে খাবার।শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ভেঙে দেয় তার থাকার জায়গা। পরের দিকে তাকে বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের থেকে নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি কারণ তিনি হতে চেয়ে ছিলেন ব্রিটিশ। ২০০৪ সালে তার একটি আত্মজীবনী বের হয় দ্য টার্মিনাল ম্যান নামে। তাছাড়া তাকে নিয়ে তৈরি হয় একটি সিনেমা, লস্ট ইন ট্রানজিট নামে।